Wednesday, 5 September 2012

সার্ব সৈন্যদের বর্বরতা

নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা বেলগ্রেড। আদালতের পার্শ্ববর্তী এলাকা সিল করে দেয়া হয়েছে। আজ পাঁচটি বসনীয় শিশুর জবানবন্দির কথা রয়েছে আদালতে। তাদের যখন হাজির করা হলো, একটি শিশু জবানবন্দি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। শিশুটির বক্তব্য হলো, আমি জবানবন্দি দিতে অপারগ। চিকিৎসকরাও তার সঙ্গে সহমত। ডাক্তারদের কথা হলো, “ছেলেটি জবানবন্দি দিতে সক্ষম নয়; কারণ তার সামনে ঘটে যাওয়া বিভীষিকাময় ঘটনার স্মৃতিকাতরতা এতই সংবেদনশীলতা তার সহ্য ক্ষমতাকে প্রায় অতিক্রম করে।”

ছেলেটির বয়স মাত্র দশ বছর। কিছুদিন আগে নিজের চোখের সামনে ছেলেটির মা-বাবাকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় সে নিজেও আহত। বাকি চারজনের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছেলেটির বয়স তের বছর। তের বছর বয়সী ছেলেটি আদালতের সামনে জবানবন্দিতে বলছে: ‘আমাদের বাড়ির সবাইকে প্রথমে একটি বাগানে জড়ো হবার নির্দেশ দেয়া হলো, এরপর একত্র হওয়া লোকদের তিনটি সারিতে দাঁড় করানো হয়। কিছুক্ষণ পরেই একজন সৈন্য বাঁশি বাজালো আর সঙ্গে সঙ্গেই তিন জন সেনা এলোপাতাড়ি ফায়ারিং শুরু করে দেয়। এরপর কী হয়েছিল জানি না। ’

এরা সার্ব সৈন্যদের বর্বরতার শিকার প্রাণে বেঁচে যাওয়া চারজন বসনীয় বালক। তাদের সামনেই সার্ব সৈন্যদের গুলিতে শাহাদাত বরণ করেছিল ওদের মাতা-পিতা। সার্বীয় সৈন্যদের ‘কাজ’ শেষ হবার পর সেখানে শান্তি বাহিনী পৌঁছে এবং আহত বালকদের হাসপাতালে পাঠায়। চিকিৎসার পর তাদের বৃটেনে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। বিগত কয়েক বছর যাবত ওরা বৃটেনেই বসবাস করছিল। আজ তাদের বেলগ্রেড-এ আনা হয়েছে। তাদের দিয়ে যে লোকটিকে সনাক্ত করা উদ্দেশ্য সে স্কার্পেন গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। গ্রুপটি এ ধরনের হাজারো মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে হাজার হাজার লোক জড়িত থাকলেও (দায়সারা) মামলা চলছে কেবল দু’জনের বিরুদ্ধেই।

নব্বইয়ে দশকের ঘটনা। সার্ব মুসলমানদের ওপর জঘন্যতম অত্যাচার চালানো হয়েছিল। দুই লাখ মানুষকে হত্যা করা হলো কেবল মুসলমান পরিচয়টি ধারণ করার ‘অপরাধে’। অথচ এসব মুসলমানের চলাফেরা, জীবনযাপন সবই ছিল পশ্চিমা জীবনধারার অনুরূপ। ইসলামের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটি ছিল নিতান্তই ছিঁটেফোটা। সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক ইসলামসম্বন্ধীয় তেমন কোনো জ্ঞানই রাখতো না। অনেকের তো নামাজ-রোজা সম্পর্কেও কিছু জানা ছিল না। কিন্তু যেহেতু তারা নিজেদের মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেয় সুতরাং তাদের বর্বরতা শিকারে পরিণত করা হলো।

যাবতীয় অত্যাচার-বর্বরতা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সম্পন্ন হয়। মুসলমানদের গাজর-মুলোর মতো ফালি ফালি বা কচুকাটা করার জন্য সার্বীয় সৈন্যরা পুরোদস্তুর ধারাবাহিক অভিযান চালিয়েছে। প্রথমে মুসলমানদের সহায়-সম্পদ কেড়ে নেয়া হয়েছে, এরপর তাদের কাছে কোনো রকম অস্ত্র না পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এ বিষয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ড কিয়ামত পর্যন্ত ইউরোপের কপালে কলঙ্ক-তিলক হয়ে থাকবে।

তবে এখানে অন্য একটি কথা বলা আমাদের উদ্দেশ্য। এই বর্বরতা মুসলমানদের জন্য একটি সুফলও বয়ে এনেছিল। মুক্তির সংগ্রামে বিপুলসংখ্যক মুসলমান নিজের বুকের রক্ত ঢেলে দেয়, তাদের ভাগ্যকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার নতুন সূর্য। অভ্যুদয় ঘটে মুসলমানদের আবাসভূমি স্বাধীন-সার্বভৌম কসোভোর। মুসলমানরা যদি বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার না করতো তাহলে সার্বিয়ার পেট চিরে স্বাধীন মুসলিম দেশটির জন্ম কখনো হতো না। সেই অর্থে সার্বিয়ায় মুসলিম নিধনের তাণ্ডবলীলা ছিল ‘সৃষ্টির প্রসব বেদনা’।

সার্বিয়ার মুসলমানদের ওপর যে বিভীষিকাই বয়ে যাক, তারা নিজেদের রক্তে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য স্বাধীন কসোভোর বীজ বপন করেছে। এভাবে নিজেদের বংশধরদের জন্য স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ উপহারটি রেখে গেছে মুক্তিকামী সেসব বীরযোদ্ধা। তার চেয়েও বড় যে উপহারটি তারা দিয়ে গেছে তা হলো- ইসলামি অনুশাসন, আমল ও সংস্কৃতি থেকে দূরে ছিটকেপড়া মুসলমানদের ইসলামি আদর্শে ব্যাপকহারে প্রত্যাবর্তন। যেখানে পুরুষদের দাড়ি ও মেয়েদের হিজাব ছিল প্রায় কল্পনার বস্তু এখন সে দেশটিতেই প্রচুরসংখ্যক মানুষকে শ্মশ্রুমণ্ডিত ও মহিলাদের ব্যাপকহারে হিজাব পরতে দেখা যায়। এটাকে তারা নিজেদের অলঙ্কার ও গৌরবের প্রতীক হিসেবেই নিয়েছে।

হিংস্র সার্বগোষ্ঠী যেভাবে সেখানকার মুসলমানদের ওপর নির্বিচারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আজ ঠিক অনুরূপ পরিস্থিতির হতে চলেছে মিয়ানমারের (রাখাইন তথা আরাকান রাজ্যের) মুসলমান জনগোষ্ঠী। এক মাসেরও বেশি সময়জুড়ে সেখানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত নির্মূল অভিযান চলছে সরকারি মদদে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে। আগে থেকেই মিয়ানমারের সামরিকজন্তা তাদের বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা করেই রেখেছে।

এবার বস্তুত, মুসলমানদের হত্যার জন্য বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পাইকারি লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি তাদের কাছে যেন কোনোক্রমেই অস্ত্র না পৌঁছুতে পারে সে নিশ্চিদ্র ব্যবস্থাটিও করে রেখেছে। যেন হাত-পা বেঁধে অসহায় একদল মানুষকে ক্ষুধার্ত ও হিংস্র নেকড়ের সামনে ছেড়ে দেয়া। এখন তাদের কেবলই অবধারিত মৃত্যুর অপেক্ষা। অতএব, প্রতিরোধের ভাবনাই অবান্তর।

কতই পরিতাপের বিষয়! আমরা একুশ শতকের আধুনিক যুগে বাস করছি কিন্তু আমাদের চোখের সামনে দিব্যি জংলি আইনের প্রয়োগ হচ্ছে। বর্বর ও অসভ্যদের উল্লাস আমরা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছি। আমরা বলছি পৃথিবীটা ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ কিন্তু ওখানকার নির্যাতিত মানুষগুলোর প্রকৃত অবস্থা আমরা জানি না! ব্যক্তিসূত্রে প্রাপ্ত তথ্য মতে, উগ্র বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত কাউকে রেহাই দিচ্ছে না। বৌদ্ধের ‘শান্তির ললিতবাণী’ এখানে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। অসংখ্য নারীর ইজ্জত হরণ করা হয়েছে। পবিত্র রমজান মাসে মুসলমানদেরকে তারাবিহ’র পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। নামাজের জন্য মসজিদে যেতে দেয়া হয়নি। নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ও খাদ্যদ্রব্যের সংকট চরমে। ইফতারের সময়টি রোজাদারের জন্য আনন্দের মুহূর্ত, এ সময়টাকে তাদের জন্য ভীতিপ্রদ করে তোলা হয়েছে।

প্রাণভয়ে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের বাংলাদেশেও কোনোপ্রকার আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী শেখ হাসিনার সরকার নিঃস্বতর এসব মানুষের সাহায্যে এগিয়ে আসা আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তারা যেন রোহিঙ্গাদের কোনো সহায়তা দিতে চেষ্টা না করে। সরকারের অভিযোগ হলো, সাহায্যকারী সংস্থাগুলো শরণার্থীদের বাংলাদেশমুখী হতে উৎসাহিত করছে।

খুবই লজ্জাজনক ও পরিতাপের বিষয় হলো, একটি মুসলিম সরকার স্বজাতির (বিশ্বের সব ভূখণ্ডের মুসলমান অভিন্ন জাতি) আক্রান্ত মানুষদের সঙ্গে শত্রুর মতো আচরণ কীভাবে করতে পারে। সচরাচর যেমনটি কোনো অমুসলিম সরকারও করে না। আর ন্যূনতম মানবিকতাবোধসম্পন্ন কারো কাছে এরূপ আচরণ প্রত্যাশিতও নয়। এই আচরণটি কেবল মিশরের পতিত স্বৈরাচার হোসনি মুবারকের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল অসহায় মুসলিম গাজাবাসীর জন্য সীমান্ত (রাফাহ ক্রসিং) বন্ধ করার মধ্য দিয়ে। শেখ হাসিনার সরকার যেন হোসনি মুবারকের পদাঙ্ক অনুসরণেই স্বাচ্ছন্দবোধ করছে। বাংলাদেশের ইসলামবিদ্বেষী সরকার যদি হোসনি মোবারকের পরিণতি থেকে শিক্ষাগ্রহণ করে সেটা অন্য যে কারো চেয়ে নিজের স্বার্থের পক্ষেই অধিক কল্যাণকর হবে।

দ্বিতীয় অবিচারটি এলো মিডিয়ার পক্ষ থেকে। তারা এবিষয়ে এক প্রকার বোবার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সোস্যাল মিডিয়ায় অসংখ্য লোক প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে, মোবাইলে হাজার হাজার ম্যাসেজ আসছে। তারা জানতে চায়, ‘আমাদের দেশের চ্যানেলগুলো মায়ানমারের দিকে তেমন একটা দৃষ্টিপাতের গরজ বোধ করছে না কী কারণে?’ ‘দেশের চ্যানেলগুলো কি পশ্চিমাদের উচিষ্ট চাটার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়লো? পাশ্চাত্য মিডিয়া লন্ডনের অলিম্পিক গেমস নিয়ে মেতে আছে তাই আমাদেরও অন্যদিকে দৃষ্টি দেবার ফুরসৎ নেই!’

পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো মায়ানমারের মুসলমানদের যদি ‘মানুষ’ বিবেচনা করতো তাহলে তাদের খবর প্রচার করা হতো। তাদের বিষয় ফিচার, প্রতিবেদন, ডকুমেন্টারি প্রচারিত হতো। আমাদের মিডিয়াগুলো চোখ-কান বন্ধ করে তাদের অন্ধ অনুসরণে মরিয়া। ওয়েস্টার্ন মিডিয়াগোষ্ঠীর কাছে যাবতীয় উপায়-উপকরণ থেকে শুরু করে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা সবই আছে। এতদসত্ত্বেও তারা নীরবতা অবলম্বন করছে আর বার্মায় সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধার ব্যাপারটিকে অজুহাত হিসেবে বড় করে দেখানো হচ্ছে। এসব গণমাধ্যমের উদ্দেশে প্রশ্ন হলো, ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধকবলিত এলাকায় পশ্চিমা মিডিয়ার প্রতিনিধিরা তো ঠিকই পৌঁছে যায় এবং গোপনে খবর সংগ্রহ ও সরবরাহ করে? মায়ানমারে সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কথাটি মেনে নিলেও কথা উঠে যে, বাংলাদেশ অভিমুখী শরণার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাত ও কথাবার্তায়ও কি নিষেধ আছে? ভারতে আসা আরকানের শরণার্থীরা অত্যাচার ও নির্যাতনের যেসব আলামত দেখিয়েছে তা প্রদর্শন ও প্রচারের জন্য যথেষ্ট নয় কি?

প্রকৃত সমস্যা অন্য জায়গায়। মিয়ানমারের নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক এমন এক ধর্মের সঙ্গে যা বর্তমানে শক্তিমানদের চক্ষুশূল। মানবতার পরম কাঙ্ক্ষিত এই জীবনব্যবস্থা তাদের কাছে অসহ্য। নইলে সুদানের খৃস্টানদের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিচ্ছিন্ন কিছু বাড়াবাড়ি নিয়ে পশ্চিমা গোষ্ঠীকর্তৃক আকাশ মাথায় তোলা হয়, অত্যাচারের শিকার স্বল্পসংখ্যক মানুষকে বারবার স্ক্রিনে প্রদর্শন করে তাদের স্বাধীনতার দাবি উচ্চকিত হয় এবং পরিশেষে তা বাস্তবায়নও করা হয়ে গেছে। তারপরও পশ্চিমাদের সেই একটাই অভিযোগ, চরমপন্থা আর মৌলবাদ। একজনের বাড়াবাড়ির জন্য তার পুরো পরিবার এমনটি জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে হত্যা করা হয়। নারী-শিশু-বৃদ্ধ কারোর রেহাই মিলে না। তাদের ক্ষেত-খামার জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এত কিছুর পর নিরুপায় মানুষগুলোর সামনে বাঁচার কোনো উপায় খোলা থাকে? বিশ্ববিবেক এ প্রশ্নের উত্তরে আজও নীরব। পৃথিবীতে আজ যে আতঙ্কের বিশ্বায়ন ঘটেছে তার নেপথ্যেই এই দ্বিমুখী আচরণ ও অবিচারপ্রবণতা। তাই ভারতের বিখ্যাত সাংবাদিক অরুদ্ধতি রায় বলতে বাধ্য হলেন, ‘সন্ত্রাস নয় অবিচারই বড় ব্যাধি।’

পশ্চিমারা মুসলমানদের সঙ্গে যদি ন্যায্য আচরণ করতো তবে সারা পৃথিবীতে সহিংসতা এভাবে ছড়িয়ে পড়তো না। হাজার-লাখ বিলিয়ন নিরাপত্তা ব্যয়ের বোঝাও ঘাড়ে চাপতো না। হয়তো সেদিন বেশি দূরে নয়; মিয়ানমারের মানচিত্র ছিঁড়ে নতুন মুসলিম স্বাধীন দেশের দাবি তুলবে নতুন প্রজন্ম। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেখানেই মজলুমের রক্ত ঝরে সেখানেই জাগে বসন্ত। নির্যাতিতের রক্তরেখায় জাগে নতুন ঊষার মানচিত্র। মিয়ানমারের বসন্ত হয়তো সময়ের ব্যাপার।

-উর্দু দৈনিক উম্মত অবলম্বনে

খন্দকার মুহাম্মদ হামিদুল্লাহ: সাংবাদিক, চট্টগ্রাম


No comments:

Post a Comment